mujib

১৯২০

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমা টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ... বাবা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা মোসাম্মৎ সায়েরা খাতুনের ৪ কন্যা ও ২ পুত্রসন্তানের মধ্যে মুজিব ছিলেন তৃতীয়। মা-বাবা আদর করে তাঁকে ‘খোকা’ বলে ডাকতেন। ফুটবল খেলার প্রতি ছিল তাঁর দুরন্ত টান। একজন মেধাবী ফুটবলার হিসেবে কৈশোরে কুড়িয়েছিলেন অসামান্য খ্যাতি। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলায় কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মিত পুরস্কৃত হতেন।

১৯৩৮

শেখ মুজিবুর রহমান ১৮ বছর বয়সে বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে বিয়ে করেন। তাঁরা ৩ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জনক-জননী ছিলেন।

১৯৪৬

উঠতি ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দেশভাগের পূর্ব মুহূর্তে, পাকিস্তানের জন্মলগ্নে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৮

শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ... উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ মার্চ তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং পাঁচ দিন পর মুক্তি দেয়া হয়। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি আদায় আন্দোলন সমর্থন করার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহিষ্কার করে। কর্তৃপক্ষের এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন শুরু করলে ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৪৯

২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। ... কারামুক্তির পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দাবি আদায় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে অন্তরীণ অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমান ২৩ জানুয়ারি সদ্য প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫২

২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা দেন একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ... জেলে বন্দি অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন এবং আন্দোলনকে সফল করার জন্য জেল থেকেই পাঠাতেন গুরুত্বপূর্ণ সব নির্দেশনা। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শেখ মুজিবুর রহমান জেলের ভেতরেই আমরণ অনশন শুরু করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট আহ্‌বান করে। আন্দোলনরত ছাত্র জনতা ১৪৪ ধারা ভাঙতে চাইলে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রফিক ,সালাম, বরকত, জব্বার, সফিউল। জেল থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান শহীদদের প্রতি গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানান। টানা সতেরো দিন শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অনশন চালিয়ে যান।

১৯৫৫

২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে সব ধর্মের মানুষের অন্তর্ভুক্তি এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহার করে দলের নাম রাখা হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ'।

১৯৫৬

শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ... ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিল্প-বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন, গ্রামীণ সহায়তা দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সংগঠনকে সুসংহত এবং সুসংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৬৪

২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ... এই সভায় সকল নাগরিকের ভোটের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি সম্বলিত প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিব যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন। দাঙ্গার পর শেখ মুজিব আইয়ুববিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল বা কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ১৪ দিন পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমানকে আবারো গ্রেফতার করা হয়।

১৯৬৬

শেখ মুজিবুর রহমান ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। ... ছয় দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। ১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি সারা বাংলায় গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় তাঁকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বারবার গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৬ সালে প্রথম ৩ মাসে তিনি ৮ বার গ্রেফতার হন।

১৯৬৮

৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ... শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে সারা দেশে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।

১৯৬৯

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র গণআন্দোলন শুরু হয়। ... টানা গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমান এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল ছাত্র সমাবেশে লাখো শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আওয়ামী লীগের এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।

১৯৭০

শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার আলোকে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বা‌ন জানান। ... আওয়ামী লীগের জন্য তিনি নৌকা প্রতীক বেছে নেন। ১২ নভেম্বর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় উপকূল এলাকায় প্রায় বারো লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনী প্রচারণা স্থগিত রেখে ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত অঞ্চলে ছুটে যান। ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয়। জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।

১৯৭১

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরো বেগবান করে । ... ১ মার্চ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কার্যত ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধান। একদিকে রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়ার নির্দেশ যেত, অপর দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে যেত শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ, বাংলার মানুষ মেনে চলতেন শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ। ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই ঐতিহাসিক বক্তৃতার মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা বাঙালি জাতির সামনে তুলে ধরেন । ১৬ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে ঢাকায় মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা শুরু হয় এবং ২৪ মার্চ পর্যন্ত এই আলোচনা চলতে থাকে। ২৫ মার্চ আলোচনা অসমাপ্ত রেখে ইয়াহিয়া খান দ্রুত ঢাকা ত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির উপর শতাব্দীর অন্যতম ঘৃণ্য গণহত্যা চালায় পাক হানাদার বাহিনী। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৯৭২

৮ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ...সেদিনই তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে লন্ডন যাত্রা করেন এবং লন্ডনে হোটেলে অবস্থানকালে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। ৯ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড হিথের সাথে দেখা করেন। ঢাকায় ফেরার পূর্বে তিনি নয়াদিল্লীতে কিছু সময় অবস্থান করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানেকে বিমান বন্দরে সাদর অভ্যর্থনা জানান। ১০ জানুয়ারি বাঙালি জাতির মুক্তির অগ্রদূত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সেদিন বাঙালি জাতি তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জানায়। লক্ষ জনতার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় স্নাত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে আসেন এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ১২ জানুয়ারি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭৪

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯ তম সাধারণ পরিষদের সভায় শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মত বাংলায় বক্তব্য রাখেন। এর মাত্র সাতদিন আগে , ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে বিশ্ববাসীর অকুন্ঠ সমর্থন পেয়ে ১৩৬ তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে।

Card image cap

১৯৭৫

১৫ আগস্ট ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক অফিসারদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। ... তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন। বাংলাদেশ এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে।